কেন, কাকে, কি জন্যে আমরা ভোট দেব, মনে হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের অভিভাবক নাই
॥ মিলটন বড়ুয়া ॥
অন্তর্বর্তী সরকারের আয়োজিত সংস্কার এবং নির্বাচনে আদীবাসী এবং সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কিছু বলা হয় নাই। দেশে ৪০ লক্ষ আদিবাসী এবং লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু রয়েছে। প্রশ্ন হলো কেন কাকে কি জন্যে আমরা ভোট দেব। সেটেলার বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মনে হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের অভিভাবক নাই। এমএন লারমা যেভাবে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সেভাবে সন্তু লারমাকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বৃহস্পতিবার (১৫জানুয়ারি) বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য আঞ্চলিক শাখার ৫ম সম্মেলনে আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু নেতৃবৃন্দরা এসব কথা বলেন।
সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটিস্থ আশিকা কনভেনশন হলের এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন, শ্রী প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, সভাপতি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি (ক) অঞ্চল। প্রধান অতিথি ছিলেন, ডা: গজেন্দ্র নাথ মাহাতো, সহ সাধারণ সম্পাদ, প্রধান আলোচক ছিলেন, শ্রী এন্ড্র সলোমার, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি, বিশেষ অতিথি ছিলেন, শ্রী বিজয় কেতন চাকমা, সভাপতি এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, শ্রী শিশির চাকমা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি। বক্তব্য রাখেন, ডা: অং উষাথোয়াই মারমা, সভাপতি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বান্দরবন ও নমিতা চাকমা, সদস্য খাগড়াছড়ি অঞ্চল, জুমিয়া ত্রিপুরা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চল, পরেশ চন্দ্র মাহাতো, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, সীরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, সমীরণ বড়–য়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটি। এছাড়াও তিন পার্বত্য চট্টগ্রামের হেডম্যান কারবারী সহ সাংবাদিক সহ আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্টীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এতে বক্তব্য রাখেন, ইন্টুমনি তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি (ক) অঞ্চল।
প্রধান অতিথি ডা: গজেন্দ্র নাথ মাহাতো, বলেন, কাপ্তাই এ হাইড্রোলিক প্রজেক্টের কারনে ১৯৬০ সাল থেকে এখানকার আদিবাসীরা দেশান্তরী হলেন। নির্যাতন নিপীড়নতো চলছেই, আর কতো দেশান্তরী হবেন। আমরা দেশের ৪০ লক্ষ আদিবাসী সহ লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘুদের সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে অধিকার প্রতিষ্ঠায়। আগামী নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন আদো হবে কি হবে না তা অস্পস্ট। ভোটে যারা প্রতিদ্বন্ধিতা করতে লড়ছেন তাদেরও আমরা চিনি এবং যারা পালিয়েছেন তাদেরও আমরা চিনি। কিন্তু আমরা দেখতে চাই আদিবাসীদের জন্য সংখ্যালঘুদের জন্য তাঁদের নির্বচনী ইশতেহারে কি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করছেন। আমাদেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ আমরা কি করবো। আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এমএন লারমা (মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা) যেভাবে সকলকে ঐকবদ্ধ করেছিলেন ঠিক একইভাবে সন্তু লারমাকে নিয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। অধিকার প্রতিষ্টায় শুধু উত্তর দক্ষিণ নয় দেশের সকল আদিবাসীদের সাথে নিয়ে মরণপন লড়াই করতে হবে।
প্রধান আলোচক শ্রী এন্ড্র সলোমার বলেন, আমরা আর কতো নির্যাতন সহ্য করবো। এই পর্যন্ত হাজারো নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছে অথচ আমার বিচার পাইনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি, বরং চ্যাপ্টারও মুছে দিতে চায়। তাই আমাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে দৌঁড়াতে না পারলে হামাগুড়ি দিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।
বিশেষ অতিথি শ্রী বিজয় কেতন চাকমা বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২৮বছর হলো বাস্তবায়ন হয় না বরং এখনো এখানে অপারেশন উত্তোরণ চলছে। তিনি মা-বোনদের উদ্দেশ্যে বলেন, কেন ধর্ষনের নির্যাতনে শিকার হবেন চলা ফেরায় নিজের সাথে আত্মরক্ষার অস্ত্র রাখুন। সন্তানদের যোগ্য মানুষ করতে হবে যাহাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।
শ্রী শিশির চাকমা বলেন, সরকার ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলে অথচ আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে নিয়মিত যে অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চলছে তার বিষয়ে নির্বিকার। এখানে এমন অবস্থা করা হচ্ছে যে সেটেলার বাঙালিদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে পরিষদ চেয়ারম্যানকে তাঁর কক্ষেই হেনস্থা করা হয়েছে, প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়েছে সরকার তার বিষয়ে কোন ব্যবস্থাও নেয় নাই। সুশীল সমাজের একটি বর অংশও স্বার্থপর। আমরাতো ভোট দিই কিন্তু আমাদের কি পরিবর্তন হয়েছে, প্রশ্ন হলো আগামীর নির্বাচনে কেন কাকে কি জন্যে আমরা ভোট দেব। মনে হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের অভিভাবক নাই।
সমীরণ বড়ুয়া বলেন, এমন পরিস্থিতি চলছে, করা হচ্ছে আমাদের ভাবা দরকার। দেশে আধিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের হত্যা, নির্যাতন নিপীড়ন, ধর্ষন ঘটনার বিচারও হয় না। সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন চালাতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের রাউজানে রাতে আঁধারে ঘরে আগুন দিয়ে একটি বড়–য়া পরিবারকেও হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান একই ছাতায় আসতে হবে। দেশের সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্টির সাথে সংযুক্ত না করে বড়ুয়া জনগোষ্টিকে সরকার বাঙালি হিসেবে দেখাচ্ছে, সত্যিকার অর্থে আমরাতো বাঙালি নই আমরাও ক্ষুদ্র বৌদ্ধ জাতি বড়ুয়া জনগোষ্ঠি। তিনি এবিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে আহ্বান করেন বড়ুয়া জনগোষ্ঠিকে সাথে রাখতে।
সাংবাদিক শ্রী সাইথোয়াই মার্মা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারে আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের জন কিছু বলা হয় নাই। এখানে এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে, আমাদের সাথে আচরণ করা হচ্ছে যেন আমরা মানুষই না। এভাবেতো হয় না। অমাদের অধিকারতো দিতেই হবে। তিনি বিগত সময়ে জেলা পরিষদ গঠনে মনগড়া এবং ইচ্ছেমত করায় সাধারণ মানুষ উপকার বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
আলোচনা সভার শুরুতে নিহত আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের মঙ্গল কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। সভা শেষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি (ক) অঞ্চল এর শ্রী প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা’কে সভাপতি, ইন্টুমনি তালুকদারকে সাধারণ সম্পাদক, কেষামং মার্মাকে সাংগঠিনক সম্পাদক করে কমিটি ঘোষনা করা হয় এছাড়ারও খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের কমিটিও ঘোষনা করা হয়েছে। পরে সকল নেতৃবৃন্দ শপথবাক্য পাঠ করেন।