বান্দরবানের থানচিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা ফের চালুর প্রস্তুতি
॥ চিংথোয়াই অং মার্মা, থানচি ॥
দেশের উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশ আইনকে উপেক্ষা করে বান্দরবানের থানচিতে এসবিএম অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম ফের চালু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃতিনির্ভর এই এলাকার জীবন-জীবিকা ও পরিবেশগত ভারসাম্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ না হলে পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, এই ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে বনের কাঠ পোড়ানো হয়। তাতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং বৃষ্টির সময় মাটি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ফসলি জমি ও নদীভূমিতে পলি পড়ায় কৃষিকাজও ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উষামং হেডম্যান পাড়া ও একটি বৌদ্ধ বিহারের ঘেঁষেই গড়ে ওঠা ইটভাটার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির কাজ চলছে। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশে ইটভাটা গড়ে ওঠা আইনত দন্ডনীয় হলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ইটভাটাটির পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই এবং সরকারি অনুমোদনও নাই। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় লোকচক্ষুর আড়ালে ইট তৈরির বিভিন্ন প্রস্তুতি চালানো হলেও রাতের আঁধারে পাহাড় থেকে মাটি ও বন থেকে কাঠ এনে ইটভাটায় মজুত করা হচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় চারপাশের বাতাস দূষিত হচ্ছে এবং বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি বৌদ্ধ বিহারের ঠিক পাশেই গড়ে ওঠা এসবিএম ইটভাটায় একদিকে পাহাড়ের মাটি ও সাঙ্গু নদীর বালু দিয়ে ইট তৈরির কাজ চলছে, অন্যদিকে ভাটার দুইটি চুল্লি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে বনাঞ্চলের কাঠ পুড়ছে এবং ভাটার ভেতরে শ্রমিকরা ইট তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী, আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কৃষিজমির পাশে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাশাপাশি পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ ও বনজ কাঠ ব্যবহারও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব আইন বাস্তব মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না। অন্যদিকে সচেতনমহল ও বাসিন্দারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই এই অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ না করা গেলে থানচির পাহাড়, বন ও মানুষের স্বাস্থ্য—সবকিছুই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। পরিবেশ রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে প্রশাসনের দৃঢ় ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
থানচি সাঙ্গু ইটভাটার (এসবিএম) মালিক আনিসুর রহমান সুজনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে ইটভাটায় দায়িত্বরত ম্যানেজার মোঃ সরোয়ারের কাছে কার্যক্রম ফের চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো বলতে অপারগতা প্রকাশ করে ফোনটি কেটে দেন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, অবৈধ ইটভাটা নির্মাণ ও পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এসবিএম ইটভাটায় কার্যক্রম ফের চালু খবর পেয়েছি, সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনে অভিযান পরিচালনা করা হবে।