শিক্ষকরা মানসিকভাবে ভালো না থাকলে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত সম্ভব নয়
॥ নিরত বরন চাকমা, বরকল ॥
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড,আর শিক্ষকরা হলেন সেই মেরুদণ্ড গড়ার নেপথ্য কারিগর। আইন,শাসন ও বিচার বিভাগের উচ্চাসনে আসীন ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সফল পেশাজীবী মানুষই মূলত শিক্ষকদের হাতে গড়া। অথচ সভ্যতার এই আলো বিতরণকারী মানুষগুলোর নিজেদের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা সহ আজ নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষকদের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানসিক চাপ কমাতে কেবল বেতন-ভাতা নয়, বরং তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
পার্বত্য ও দুর্গম এলাকার শিক্ষকসমাজ এবং সমতলের শিক্ষকদের বাস্তবচিত্র দেখলে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। পাহাড়ি বা দুর্গম অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী সব শিক্ষক সমকাজে সমমর্যাদার সুযোগ পান না, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক রকম নয়। এমন বহু শিক্ষক আছেন যাদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর’ দশা। শহুরে বা সমতল এলাকার শিক্ষকদের একাংশের যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্দশাও কম নয়। সকালে যথাসময়ে বাসে ওঠার তাড়াহুড়ো,বাস মিস করা কিংবা বাসে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করার মতো দৃশ্য একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার সাথে বেমানান। শিক্ষকদের এই রিক্ততা ও কষ্টের দৃশ্য শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে, দুর্গম পাহাড়ি বা প্রান্তিক এলাকায় যারা শিক্ষকতা করছেন, তাদের কষ্ট আরও বহুগুণ বেশি। মাইলের পর মাইল দূরে নির্জন স্থানে থাকার মতো ন্যূনতম কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষককে স্থানীয় পাড়াবাসীর কাছে অনুরোধ করে কোনো রকমে কুঁড়েঘরে দিনযাপন করতে হয়। শিক্ষকতার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশার সাথে যা সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেক স্থানে তো থাকার কোনো ব্যবস্থাই নেই। এর পাশাপাশি,কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী বা উঠতি রাজনৈতিক নেতাদের অনৈতিক বলয় ও ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয় শিক্ষকদের।
একজন শিক্ষককে প্রতিনিয়ত বহুমুখী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়। একদিকে তীব্র অর্থসংকট, অন্যদিকে পরিবার ও সমাজ রক্ষার লড়াই—সব মিলিয়ে এক কঠিন মানসিক চাপ নিয়ে তাদের চলতে হয়। নিজের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে, পরিবার-সন্তানকে দূরে রেখে, বুকে অদম্য সাহস আর হাসিমুখ নিয়ে তারা অন্যর সন্তানদের মানুষ করে যান।কিন্তু এর বিনিময়ে তারা কি পান কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও মর্যাদা? অবশ্যই কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে,কিন্তু তার জন্য পুরো শিক্ষকসমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না এবং তাদের প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত রাখা যায় না। হাতে গোনা কয়েকজনের অপরাধের দায় সামগ্রিক শিক্ষক পেশার ওপর চাপানো অন্যায়।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, শিক্ষকরা মানসিকভাবে ভালো না থাকলে গুণগত শিক্ষা কখনো নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের কাজের স্পৃহা বাড়াতে এবং তাদের মানসিক চাপ কমাতে পাহাড় ও দুর্গম এলাকায় নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সড়কপথের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা জরুরি। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান,নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নত ও আলোকিত জাতি গঠন অসম্ভব। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে দুর্গম এলাকায় নিরাপদ আবাসন এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সুব্যবস্থা করে শিক্ষকদের পেশাগত সম্মান ও মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে ঋণমুক্ত করার আহ্বান থাকলো।