শিরোনাম
অবহেলিত জনপদের শিক্ষাগুরু এঁর ৩৩ বছরের কর্মজীবন শেষে চোখের জ্বলে বিদায়রাঙ্গামাটি হাসপাতালে এবার চোখের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রমের উদ্ভোধনফটোস্ট্যাট দোকানে ল্যাপটপ নিয়ে অনলাইন ভূমি সেবাকে নিরুৎসাহিত করুন: ভুমি প্রতিমন্ত্রীখাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে চলেছে পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্য, অভিযানে দুটি গাড়ি জব্দলংগদুতে এ্যাম্বুলেন্সের চালক এর অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগদীঘিনালায় বিজু মেলা উদযাপনে জোনের আর্থিক অনুদান প্রদানআতংকের নাম ‘তুইল্লার পাহাড়’ লামায় সেনা কর্মকতা হত্যা, প্রয়োজন যৌথবাহিনীর অভিাযানবান্দরবনের রোয়াংছড়িতে জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন সভাখাগড়াছড়ির রামগড় স্বাস্থ্য কমপ্লক্সের চিকিৎসক বিজয় এর হামলায় সহকর্মী আহতহালদা নদীর মানিকছড়ি অংশে বাঁধ নির্মাণ ত্রিপাল জব্দ করেছে মৎস্য প্রশাসন

ওরাই যেন আমাদের অস্তিত্বকে মেলে ধরে, বাঁচিয়ে রাখে, পরিচয়ও করিয়ে দেয়

১৭

॥ পূষ্প মোহন চাকমা ॥
বলছিলাম রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার আমতলা, রাজধনছড়া আর ভালাছড়ি প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর স্থিরচিত্রের কথা। ঐ যে দূরের পাহাড়গুলোকে যখন দেখি, মনে হয় তারা নীরবে পাহারা দিচ্ছে তাদের কোলঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা সবুজ ধানক্ষেত। সেই নীরবতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ গল্প। আমাদের জীবন, সংগ্রাম আর টিকে থাকার গল্প। কাদামাখা সরু কাঁচা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, শহরের কোলাহল আর তাড়াহুড়ো অনেক দূরে ফেলে এসেছি। এই পথ শুধু মাঠে যাওয়ার রাস্তা নয়, এটি যেন গ্রামীণ জীবনের দিকে ফিরে যাওয়ার এক নিঃশব্দ ডাক।

চারপাশে নীল আকাশ, হালকা বাতাস আর ভেজা মাটির গন্ধ, এই সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি এখানে খুব কাছের এবং খুব আপন। এখানে মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে কোনো দেয়াল নেই; আছে শুধু নির্ভরতার সম্পর্ক। এই এলাকার কৃষকেরা এখনও প্রকৃতির নিয়ম মেনেই জীবন চালান। ধানক্ষেতের পাশে বাঁশের খুঁটি আর জালের ব্যবহার দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি ফসল এখানে কত যত্ন আর অভিজ্ঞতা দিয়ে আগলে রাখতে হয়।

সকাল হলেই তারা মাঠে নেমে পড়েন। কাদায় পা ডুবিয়ে, নীরবে হেঁটে পৌঁছে যান নিজেদের জমিতে। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও চোখে থাকে আশার আলো, কারণ এই ধানই তাদের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখবে, আগামী দিনের ভরসা জোগাবে। পাহাড়ঘেরা এই সমতল জমি শুধু খাদ্য উৎপাদনের জায়গা নয়, এটি একটি জীবন্ত সংস্কৃতির ধারক। এখানকার মানুষ এখনও প্রতিবেশীদের খোঁজ নেয়, কাজ ভাগাভাগি করে, আর ছোটবেলা থেকেই শেখে, প্রকৃতিকে সম্মান না করলে জীবনও টেকে না। শহরের দ্রুতগতির জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে এই গ্রামগুলো যেন সময়কে ধীরে চলতে শেখায়। এখানে প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা আলাদা করে অনুভব করা যায়। ওরাই যেন আমাদের অসস্থীত্বকে মেলে ধরে, বাঁচিয়ে রাখে।

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেও দুশ্চিন্তা আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টি, কখনও দীর্ঘ খরা। সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ঝর্ণার উৎসগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলে সেচের পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি আর কৃষিযন্ত্রের আকাশচুম্বী দাম। এসব চিন্তা তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিলেও তারা হাল ছাড়ে না। তাই তাদের পাশেই সেই সবকে খুঁজি আর মেঠো পথের হাল ধরি নিজ গন্তব্যে।

প্রতিবছর নতুন আশায় আবার বীজ বোনে, আবার মাঠে নামে, আবার সবুজের স্বপ্ন দেখে। তাদের বিশ্বাস, এই মেহনত আর নিরলস পরিশ্রম শুধু পেটের দায় মেটায় না, মানুষের শরীর আর মনকেও সুস্থ রাখে, জীবনে তারুণ্য ধরে রাখে। প্রকৃতির সঙ্গে এই একাত্ম জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন মানেই কেবল কংক্রিট আর ইট নয়, উঁচু দালান নয়। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঁচার মধ্যেও আছে এক ধরনের অগ্রগতি, এক গভীর শান্তি।

পাহাড়, মাঠ আর কাঁচা পথের এই নীরব গল্প আমাদের শিকড়ের কথাই বলে। যেখানে ফিরে তাকালে এখনও পাওয়া যায় জীবনের আসল রং, ‘সবুজ’। বলছিলাম রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার আমতলা, রাজধনছড়া আর ভালাছড়ি প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর স্থিরচিত্রের কথা। যদিও পাহাড়ের প্রায় প্রতিটি জনপদেই এমন নীরব, সুন্দর আর কাব্যময় গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। ওরাই যেন আমাদের অস্তিত্বকে মেলে ধরে, বাঁচিয়ে রাখে, পরিচয়ও করিয়ে দেয়।