॥ মাঈন উদ্দিন বাবলু, গুইমারা ॥
সবুজে সবুজে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে পাহাড়ে উৎপাদিত হলুদ। বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এক প্রান্তে ড্রামে আগুন জ্বালিয়ে কাঁচা হলুদ সিদ্ধ করা হচ্ছে, অন্য প্রান্তে শীতের মিষ্টি রোদে শুকানোর অপেক্ষায় মাঠজুড়ে ছড়ানো হয়েছে হলুদ। শুকানোর পর বিশালাকার ফলার মেশিনে উপরি অংশ ছাড়িয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এসব হলুদ।
সবুজ পাহাড়ে হলুদের এমন দৃশ্য নতুন নয়। বরাবরই হলুদ চাষে পাহাড়ের জুড়ি নেই। পতিত ও টিলাভূমিতে উৎপাদিত পাহাড়ি হলুদের খ্যাতিও রয়েছে দেশজুড়ে। তবে পাহাড়ি কৃষিপণ্যের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে হলুদ। এ কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা ভিড় করেন খাগড়াছড়ির গুইমারা হাট-বাজারে।
অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি মৌসুমে পাহাড়ে হলুদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে। গত বছর যেখানে কাঁচা হলুদ বিক্রি হয়েছিল প্রতি মণ ৪০০ টাকায়, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ১৩০০ টাকায়। শুকনো হলুদ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৮ থেকে ৮ হাজার ৫শত টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এমনকি শুকনো হলুদের উচ্ছিষ্ট অংশ মশার কয়েল তৈরির কাঁচামাল হিসেবে প্রতি মণ ৫০০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সম্প্রতি গুইমারা উপজেলার রামসুবাজার, জালিয়াপাড়া, বড়পিলাক, সিন্ধুকছড়ি ও হাফছড়ি এলাকা ঘুরে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে হলুদ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত গুইমারা বাজারের ব্যবসায়ী মো. জহির মেম্বার বলেন, আগের কয়েক বছর লোকসান গেলেও এ বছর হলুদের দাম ভালো পারছি। ভালো দাম পাওয়ায় আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছি।

গুইমারা বাজারে হলুদ বিক্রি করতে আসা কৃষক মোঃ সোহেল বলেন, প্রতি মণ হলুদ ১১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এ বছর দাম ভালো হওয়ায় গত বছরের লোকসান উঠে আসবে। সিন্ধুকছড়ি এলাকার চাষি হরুপদ ত্রিপুরা ও চিনিয়ং মারমা জানান, গত বছর দাম কম থাকায় অনেকেই হলুদ চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বছর ভালো দাম পাওয়ায় পাহাড়ের চাষিরা আবারও হলুদ চাষে স্বপ্ন দেখছেন।
দীর্ঘদিনের হলুদ ব্যবসায়ী মোঃ সেলিম ও আরমান আলী বাবু বলেন, পাহাড়ি হলুদ অত্যন্ত মানসম্মত ও সুগন্ধি। দেশজুড়ে এর চাহিদা রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলে বিদেশি হলুদের আমদানি কমিয়ে দেশীয় হলুদের বাজার আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
গুইমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ রেজাউল করিম বলেন, পাহাড়ি হলুদ চাষে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় এর রং, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। তিনি আরও বলেন, অনাবাদি ও পতিত জমিতে হলুদ চাষে কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকৃষকদের হলুদ চাষে প্রনোধনা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি হলুদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা জরুরি। তাতে পাহাড়ের প্রান্তিক চাষিদের জীবনমান উন্নয়নসহ দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই কৃষক-ব্যবসায়ী এবং উদ্যক্তারা বলছেন এবারে খাগড়াছড়ির গুইমারায় হলুদের বাম্পার ফলন, যেন রং ছড়িয়ে কৃষক-ব্যবসায়ী উদ্যোক্তার মনেও।