শিরোনাম
হোমিওপ্যাথি’র জনক ডাঃ হ্যানিম্যানের ২৭১তম জন্মদিন পালন রাঙ্গামাটিতেপর্যটনের খাতে কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনামাটিরাঙ্গায় বৈসাবি ও নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ খাদ্যশস্য বরাদ্দ প্রদানরাঙ্গামাটিতে বলাকা ক্লাবের উদ্যোগে নাইট মিনিবার ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধনরোয়াংছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারের পাশে জেতবন বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষুমানবতার সেবায় যুগান্তকারী চিকিৎসা দার্শনিক মহাত্মা “স্যামুয়েল হ্যানিম্যান”আমাদের ভাষা সংস্কৃতিকে যেন ভুলে না যাই সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে: উষাতন তালুকদারখাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ক্ষত পাহাড় পরিদর্শনে কর্মকর্তারা, পরিবেশ আইনে মামলাপাহাড়ের বৈচিত্র্যে মানবিক ঐক্যের সুর: বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রানদীঘিনালায় অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের মাঝে সহায়তা প্রদান

মানবতার সেবায় যুগান্তকারী চিকিৎসা দার্শনিক মহাত্মা “স্যামুয়েল হ্যানিম্যান”

১৬

॥ ডা. পুষ্প মোহন চাকমা ॥
১০ এপ্রিল, ১৭৫৫ সালের এই দিনে পৃথিবীর মানব জাতির কল্যাণে জার্মানীর মাটিতে এক মহান মানবাত্মার জন্ম হয়। যার নাম হোমিওপ্যাথির জনক “ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান”। প্রতি বছর এ দিনে বিশ্বজুড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ও অনুরাগীরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যানকে। যিনি সে সময়কার এ্যালোপ্যাথির একজন উচ্চমানের ডাক্তার ও শিক্ষক হয়েও মানবসভ্যতার বিকল্প চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। যার উদ্ভাবনী দর্শন, নীতি-বিজ্ঞান সাফল্যের সাথে আজ দু’শতাধিক বর্ষ অতিক্রান্ত হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থায় একবিন্দু পরিবর্তন ঘটেনি, ঘটবেও না। বরং তাঁর উত্তরসূরী কান্ডারীগণ দিনদিন তাঁর উদ্ভাবনী শক্তিকে আরও উত্তরোত্তর সাল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় হয়তো আগামী ৫০-১০০ বছরে তাঁর চিকিৎসা দর্শন পৃথিবীর রুগ্ন মানবতার এক অনন্য উপায় হিসেবে আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা করে নিয়ে যেতে পারে, যদি বিশ্ব বরেণ্যরা বিশ্বের কোটি মানুষের জনপ্রিয় এই বিকল্প চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অর্গাননের মত সফল অপরিবর্তনযোগ্য নীতি ও গতিধারার সাথে স্বাধীন এগিয়ে যাওয়াকে ন্যায্য সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে ধন্য হন।

তাঁর জন্মদিন কেবল একটি ব্যক্তির স্মরণ নয়, বরং একটি চিকিৎসা দর্শনের উদযাপন, যা “Similia Similibus Curentur” নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। শৈশব থেকেই হ্যানিম্যান ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী এবং সত্য অনুসন্ধানে কৌতুহলী এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিনি গভীরভাবে বিচলিত হন। তাই সে তাঁর চিকিৎসা পেশাকে সমর্পন করেন। বেঁচে নেন সীমিত আয় ও অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের অনুবাদ কর্ম। মহান চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করেও তিনি তাঁর মানব কল্যাণ চিন্তাকে জলাঞ্জলি দেন নি। তাই তিনি একজন বহু ভাষার পন্ডিত হিসেবে ডাক্তারী বইসমূহ এক দেশের ভাষা হতে অন্য দেশের ভাষায় অনুবাদের সাধনাটুকু হাতে নেন। যাতে সকল দেশের রোগীরা সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হন। আর সেই অনুবাদ কর্ম থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথের অনুসন্ধান যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় হোমিওপ্যাথি। এতেই বোঝা যায় মেধা, সততা আর মহানুভবতা থাকলে কোন অসীম শক্তি আর উপায় কোন এক সময় আপনি নিজের সান্নিধ্ উপস্থিত হবেই।

হ্যানিম্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো Organon of Medicine গ্রন্থ, যেখানে তিনি হোমিওপ্যাথির মৌলিক নীতিগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। যা তাঁর উদ্ভাবনী চিকিৎসা দর্শনকে বিজ্ঞান হিসেবে মেনে না নিলেও ধংস করার মত উপায় রাখেনি “অর্গানন”। তাই ইতিহাসের পাতায় চোখেপড়ে যে, অনেক বিরোধীপক্ষ হোমিওপ্যাথিকে ধংস করার জন্য হাত দিতে এসে সে নিজেই হোমিওপ্যাথির সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। অকপটে অনুশোষণা প্রকাশ করেন হোমিওপ্যাথির প্রতি তাঁর অতীতের ভুল ধারণার জন্য। তবে এটি অনুশোষণা নয়, এটি হলো মহত্ব। যে তাঁর ভুল বুঝে প্রকাশ করতে জানে তাঁর চেয়ে সততা আর মহত্ব আর কিছু নেই। হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন, রোগ কেবল বাহ্যিক লক্ষণ নয়; এটি মানবদেহের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তির (Vital Force) ব্যাঘাতের বহিঃপ্রকাশ। তাই চিকিৎসাও হওয়া উচিত ব্যক্তি কেন্দ্রিক এবং সামগ্রিক। যেন রোগীর অদৃশ্য রোগশক্তি দ্বারা বিকৃত দেহ-মনের জীবনী শিক্তিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। তিনি সুুস্থ মানুষের দেহে “প্রুভিং” পদ্ধতির মাধ্যমে ঔষধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রমাত্রার (Minimum Dose) ধারণা চিকিৎসা জগতে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করে, যেখানে রোগীকে কম মাত্রায়, কিন্তু সঠিক ঔষধ দিয়ে আরোগ্য লাভের পথ দেখানো হয়। বর্তমান বিশ্বে, নানা সমালোচনা সত্ত্বেও হোমিওপ্যাথি কোটি মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল রোগে এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও সিজন্যাল একিউট রোগে ইহার সফলতা বিস্ময়ের মত। হোমিওপ্যাথির এই আস্থার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন হ্যানিম্যান তাঁর নিরলস গবেষণা, ত্যাগ এবং মানবসেবার মননশীলতার মাধ্যমে। তিনি মানব কল্যাণে এই বিজ্ঞান ও দর্শন উদ্ভাবনে বহু লাঞ্ছনা বঞ্চনার শিকার হন। জীবন যাপন করতে হয় দারিদ্রতার সাথেও। তবু তিনি তাঁর সাধনায় বিচলিত হননি। তাঁর সেই অবিচল ত্যাগ ও বিসর্জনই আজ রুগ্ন মানবতার এক আস্থার জায়গা করে নিয়েছে।

১০ এপ্রিল আমাদের জন্য শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারের দিনও বটে। আমরা যারা হোমিওপ্যাথি চর্চা করি, তাদের উচিত হ্যানিম্যানের আদর্শ, সততা, পর্যবেক্ষণ এবং রোগীর প্রতি গভীর সহানুভূতি নিজেদের জীবনে ধারণ করা। মহাত্মা হ্যানিম্যান শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক দার্শনিক, গবেষক এবং মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর এই উদ্ভাবিত বিজ্ঞানকর্মে তাঁর অনুসারীদের মাঝে বেঁচে আছেন এবং যতদিন পৃথিবীতে মানব সভ্যতা থাকবে, ততদিন তিনি সভ্যতার মাঝেই বেঁচে থাকবেন। তাঁর জন্মদিনে আজ তাঁকে জানাই অকৃত্রিম বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। যুগে যুগে মানব কল্যাণে পৃথিবীতে জন্ম হোক তোমার মত মহান জনদরদী, জ্ঞানী ও সৎব্যক্তির।

লেখক: হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক (ডি.এইচ.এম.এস, ঢাকা)