॥ চিংথোয়াই অং মার্মা, থানচি ॥
বান্দরবানের থানচি উপজেলায় যেখানে একসময় প্রকৃতি নিজস্ব ছন্দে বেঁচে ছিল, সেখানে চলছে বন নিধনের নির্মম কর্মযজ্ঞ। অবাধে গাছ কাটা, বালু-পাথর উত্তোলন, বন্যপ্রাণী নিধন, পাচার ও অবৈধভাবে বাণিজ্যের লাগামহীন বিস্তার এখন প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা ছাড়া এই অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধ করা কঠিন। অনেক দরিদ্র মানুষ জীবিকার তাগিদে শিকার ও বন্যপ্রাণী বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে যা একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। এবং রিজার্ভ এলাকায় গাছ কর্তন, বালু-পাথর উত্তোলন ও পাচারের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পদক্ষেপ গ্রগ্রহণে দাবির তাদের।
অভিযানের অংশ হিসেবে থানচির বিভিন্ন ইউনিয়নে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করার জরুরি। এতে করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং শাস্তির বিষয়গুলো যেন তুলে ধরা হয়। বন বিভাগের রেঞ্জের সংশ্লিষ্টরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন অবৈধভাবে গাছ কর্তন, বন্যপ্রাণী হত্যা বা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সঠিক তথ্য দিয়ে এলাকাবাসীর কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।
এদিকে প্রকৃতি দল নেতা সুমী খিয়াং জানান, থানচির মতো জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকায় বন্যপ্রাণী রক্ষা করা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিধনযজ্ঞ বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বহু প্রপ্রজাতির গাছ ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যার প্রভাব পড়বে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর।
সচেতনমহল বলছেন, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন, বনের গাছকর্টন, বন্যপ্রাণী নিধন ও পাচারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হতে হবে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি এবং কিছু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় পাহাড়ে চলছে প্রকাশ্য শিকার ও পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব।
প্রকৃতি দলের সদস্য অংপানু মার্মা, রোঁজ বম ও পারিং ম্রো বলছেন, সতর্কবার্তা আরও ভয়াবহ— পরিবেশ নিমর্ম নিধনযজ্ঞ এভাবে চলতে থাকলে পাহাড়ি বনভূমি অচিরেই প্রাণশূন্য হয়ে পড়বে। খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়বে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ভোগ করতে হবে মানুষকেই।
এবিষয়ে বনবিভাগের থানচি রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ অফিসার সৈয়দ মহসিন আলী বলেন, পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত হলেও অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্যে তা দ্রুত ধ্বংসের মুখে পড়েছে। আমরা মানুষকে বোঝাতে চাইবন্যপ্রাণী ধ্বংস মানে নিজের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা। প্রকৃতি যদি বাঁচে, তবেই মানুষ বাঁচবে।
অন্যদিকে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বান্দরবান জেলা পরিষদের ইউএনডিপি উদ্যোগে এই প্রচারভিযান একটি ইতিবাচক এলাকার জনমনে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। জেলা পরিষদ ও ইউএনপিডি এই উদ্যোগ কেবল সচেতনতা তৈরির লড়াই নয়, বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষারও সংগ্রাম।