॥ মোঃ আবুল হাসেম, মাটিরাঙ্গা ॥
পাহাড়ের ঢালে এখন শুধুই হলুদের সমারোহ। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় দিগন্তজোড়া মাঠে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার সূর্যমুখী। বসন্তের বাতাসে দোল খাওয়া এই ফুলের হাসি শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদেরই মুগ্ধ করছে না, বরং স্থানীয় কৃষকদের মনেও জোগাচ্ছে নতুনের স্বপ্ন। কম খরচ আর অধিক লাভে পাহাড়ি জনপদে সূর্যমুখী চাষ এখন এক নতুন কৃষি বিপ্লবের পথে।
সূর্যমুখী ফুলের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে। সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত হলে কুঁড়ি ও কচি গাছগুলো পূর্বমুখী থাকে এবং দিনের সঙ্গে সঙ্গে সূর্য পশ্চিমে অগ্রসর হলে ফুলও ধীরে ধীরে সেই দিকে ঘুরে যায়। আবার সূর্য অস্ত যাওয়ার পর রাতে ফুল পুনরায় পূর্বদিকে মুখ করে অবস্থান নেয়, যাতে পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আলো গ্রহণ করতে পারে। এই প্রাকৃতিক আচরণকে বলা হয় ‘হেলিওট্রপিজম’। বিশেষ করে কচি সূর্যমুখী গাছে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে গাছ সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করতে পারে, যা বৃদ্ধি ও বীজ গঠনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মাটিরাঙ্গার কামিনী মেম্বার পাড়ার বাসিন্দা যশোদা রাণি ত্রিপুরা। জেলা পরিষদের জলবায়ু সহনশীল (করলিয়া) প্রকল্পে কর্মরত এই নারী উদ্যোক্তা আগে নিজের ৩৩ শতক (১ বিঘা) জমিতে ধান চাষ করতেন। তবে এবার ব্যক্তিগত শখ আর লাভের অংকের হিসাব মিলিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন সূর্যমুখী। যশোদা রাণি জানান, এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে তার খরচ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। বিপরীতে তিনি প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১০ মণ ফলনের আশা করছেন। তিনি বলেন, “বড় আকারের ফুল হলে মাত্র ৫টি ফুল থেকেই প্রায় ১ কেজি বীজ পাওয়া যায়। বাজারমূল্য ঠিক থাকলে ধানের চেয়ে এতে লাভ অনেক বেশি।” তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৩৫ জন কৃষককে টাটা কোম্পানির হাইব্রিড টিএসএফ-২৭৫ জাতের সূর্যমুখী বীজ ও প্রয়োজনীয় সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাইন্দং ইউনিয়নের বটতলী এলাকার কৃষক সোহেল মিয়া এবার ৫ বিঘা জমিতে এই জাতের আবাদ করেছেন। সোহেল মিয়া তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, কৃষি অফিস থেকে বিঘা প্রতি ২ কেজি বীজ ও সার পেয়েছি। ধানের তুলনায় এতে সেচ ও রোগবালাই অনেক কম। গাছের বৃদ্ধিও বেশ ভালো হয়েছে। ফলন আশানুরূপ হলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা আছে।
মাটিরাঙ্গার এই হলদে বাগিচাগুলো এখন স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন ছবি ও সেলফি তুলতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ায় বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এলাকাটি এক ধরনের দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় সূর্যমুখী চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তাইন্দং ইউনিয়ন ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাইন্দং ইউনিয়নের বটতলী এলাকায় কৃষক সোহেল মিয়া ৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড টিএসএফ-২৭৫ জাতের সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিঘা প্রতি ২ কেজি বীজ এবং প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করা হয়েছে। আমি মাঠপর্যায়ের কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছি আশা করছি সূর্যমুখীর এবার ভাল ফলন হবে।
মাটিরাঙ্গা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, সূর্যমুখী একটি স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল। সঠিক সময়ে বপন, আগাছা দমন ও পরিমিত সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় মাটির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো থাকায় সূর্যমুখীর বৃদ্ধি দ্রুত হয়। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ সেলিম রানা জানান, এখানকার মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এবং উৎপাদিত তেল যেমন সুগন্ধি, তেমনি সুস্বাদু। মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শাহাবুদ্দিন আহমেদ বিষয়টিকে সুদূরপ্রসারী হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “পাহাড়ি অঞ্চলে বিকল্প ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছি। এটি ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এক সময় যেসব পাহাড়ি জমি বছরের বড় একটা সময় পড়ে থাকত, সেখানে এখন দোল খাচ্ছে সোনালী সূর্যমুখী। যশোদা রাণি বা সোহেল মিয়ার মতো কৃষকদের হাত ধরে মাটিরাঙ্গায় শুরু হয়েছে এক নতুন সম্ভাবনা। যথাযথ বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত হলে এই ‘সূর্যমুখীর হাসি’ ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি পাহাড়ি কৃষকের ঘরে।