॥ মোঃ আবুল হাসেম, মাটিরাঙ্গা ॥
দেশে এখন পুরোপুরি শীতকাল। এই সময়ে উঁচুনিচু পাহাড় পেরিয়ে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে ঝলমলে রোদে ছড়িয়ে পড়েছে সরিষা ফুলের দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য। মাঠে মাঠে হলুদ সরিষা ফুলের সমারোহ এবং মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ শুধু চোখ জুড়াচ্ছে না, প্রতিটি সরিষার দানায় দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্নও। হলুদে মোড়ানো এসব মাঠ যেন জীবনের ছোট ছোট অপূর্ণ শখ ও আগামী দিনের আশার রোদ ধারণ করেছে যা পাহাড়ি জনপদের কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন গল্প বলছে।
সরাসরি মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার চড়পাড়া, তাইন্দং, তবলছড়ি এবং গোমতী ইউনিয়নের বান্দরছড়ায় যতদূর চোখ যায়, ততদূর বিস্তৃত সরিষার হলুদ মাঠ। দর্শনার্থীরা এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে ছুটে আসছেন, কেউ কেউ সেই সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করছেন। দূর থেকে ভেসে আসছে সরিষা ফুলের মিষ্টি গন্ধ। মধু সংগ্রহে ফুলে ফুলে ঘুরছে মৌমাছির দল। তাদের গুনগুন ভরে তুলেছে চারপাশ। মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় কৃষকরা তাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে সরিষা বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ কম হলেও লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। মাটিরাঙ্গার কৃষকরা আশা করছেন, এ বছর তারা সরিষা থেকে বড় অংকের মুনাফা অর্জন করবেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মাটিরাঙ্গার বিভিন্ন ইউনিয়নে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে কৃষকরা সরিষা চাষে ঝুঁকেছেন। গত বছরের তুলনায় সরিষার আবাদি জমি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অধিদপ্তরের উদ্যোগে চলতি মৌসুমে ২৭০ জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে জনপ্রতি বারি-সরিষা-১৪ জাতের ১ কেজি সরিষার বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ২৫ জন কৃষকের মাঝে জনপ্রতি বিনা-১১ ও বিনা-৯ জাতের ৮০০ গ্রাম করে সরিষার বীজ প্রদান করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেক কৃষক সরিষার আবাদ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছিল, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল হেক্টরপ্রতি ১.৪০ মেট্রিক টন। অপরদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছেহেক্টরপ্রতি ১.৫০ মেট্রিক টন।
কৃষকদের কথা বলতে গেলে কৃষক মনির হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরিষা গাছগুলো সতেজ ও সবল হয়েছে। ক্ষেতজুড়ে ভালোভাবে ফুল এসেছে এবং দানা ধরার অবস্থাও আশাব্যঞ্জক। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবারের ফলন গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে আশা করছি। পাশাপাশি বাজারে সরিষার দাম ভালো পাওয়া গেলে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হব। কৃষক জামাল হোসেন বলেন, পাহাড়ি জমিতে সরিষা চাষ তুলনামূলক সহজ এবং খরচও কম। এবারের ফলন দেখে আমি খুবই সন্তুষ্ট। চলতি মৌসুমে রোগবালাই কম ছিল এবং সঠিক সময়ে বীজ ও সার পাওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। স্থানীয় কৃষক জমির মিয়া বলেন, আগে ধান কাটার পর জমি পতিত রেখে দিতাম। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সরিষা আবাদ করেছি। গাছে ফুল ও দানার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভালো ফলন হবে এবং লাভের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। গোমতী ইউনিয়নের বান্দরছড়ায় কৃষক মোশারফ হোসেন ও শাহেদ প্রায় ২.৫০ একর জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। তারা জানান, গত মৌসুমে স্বল্প পরিসরে সরিষা চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ায় এ বছর অধিক জমিতে আবাদে আগ্রহী হয়েছেন। তারা আরও বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সরিষা পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী।
মাটিরাঙ্গা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, উপজেলা কৃষি বিভাগ কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সরিষার বীজ, সারসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। সরিষা চাষ মাটি ও কৃষক উভয়ের জন্যই লাভজনক। ফলন ভালো হওয়ায় আগামীতে এই অঞ্চলে সরিষার চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সবুজ আলী জানান, চলতিমৌসুমে মাটিরাঙ্গায় বারি-সরিষা-১৪, বিনা-১১ ও বিনা-৯ জাতের উচ্চ ফলনশীল সরিষার বীজ বপন করা হয়েছে। সরকারিভাবে প্রণোদনার আওতায় উন্নতমানের বীজ ও সার বিতরণ করায় সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে সরিষার রেকর্ড ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ হবে, কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।