শিরোনাম
অবহেলিত জনপদের শিক্ষাগুরু এঁর ৩৩ বছরের কর্মজীবন শেষে চোখের জ্বলে বিদায়রাঙ্গামাটি হাসপাতালে এবার চোখের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রমের উদ্ভোধনফটোস্ট্যাট দোকানে ল্যাপটপ নিয়ে অনলাইন ভূমি সেবাকে নিরুৎসাহিত করুন: ভুমি প্রতিমন্ত্রীখাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে চলেছে পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্য, অভিযানে দুটি গাড়ি জব্দলংগদুতে এ্যাম্বুলেন্সের চালক এর অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগদীঘিনালায় বিজু মেলা উদযাপনে জোনের আর্থিক অনুদান প্রদানআতংকের নাম ‘তুইল্লার পাহাড়’ লামায় সেনা কর্মকতা হত্যা, প্রয়োজন যৌথবাহিনীর অভিাযানবান্দরবনের রোয়াংছড়িতে জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন সভাখাগড়াছড়ির রামগড় স্বাস্থ্য কমপ্লক্সের চিকিৎসক বিজয় এর হামলায় সহকর্মী আহতহালদা নদীর মানিকছড়ি অংশে বাঁধ নির্মাণ ত্রিপাল জব্দ করেছে মৎস্য প্রশাসন

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সময় ঘন্টা বেঁধে দেওয়া যেমন হুমকি তেমনি প্রধান ফটকে তালা দেওয়াও হুমকী এবং অপরাধ

১৭

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষক নিয়োগ হইয়াও হইলো শেষ অবস্থা। এক দিকে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক শুন্যতা বিরাজ করছে অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগ দিতে গিয়ে জটিলতায়ও পড়েছে বার বার। শিক্ষক শুন্যতার কারনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও পর পর তিন বার বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে। এবার ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ হওয়ার পরই বাঁধা আপত্তিতে এবারও স্থগিত হয় নিয়োগ পরীক্ষা। পরে ক্ষুব্ধ চাকুরীপ্রাথীরা রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের প্রধান এবং অভ্যন্তরীণ সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে সেখানেই বিক্ষোভ করেন। তবে চাকুরী প্রার্থীদের দাবি রাজনৈতিক দলের নামে ভুঁইফোড় কিছু সংগঠন বিভিন্ন তালবাহানা করে শিক্ষক নিয়োগ বাঁধাগ্রস্ত করে আসছে। তারা এও বলছে দালালের খপ্পড়ে পড়ে হালাল বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন অবস্থা বলে চাকুরী প্রার্থীদের দাবি।

দেখা যায়, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে ২০২২ সালের ২৯ মে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শুন্য পদে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক সকল কাজ শেষে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা হলে সে-সময়ে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা স্থগিত করে জেলা পরিষদ। পরে ২০২৪ সালে ২৪ মে আবারো লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরীক্ষার তিন দিন আগে ২য় বারের মত আবারো পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। এবারও অনিবার্য কারণ দেখিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করে জেলা পরিষদ যার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত ১৪ নভেম্বর (শুক্রবার) ২০২৫ইং।

স্থগিতের কারণ হিসেবে দেখা যায়, পরিষদের চলমান নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ম বহির্ভুত, এক তরফা, তথ্য বিভ্রাট ও বৈষম্যমূলক দাবি করে এবার পরীক্ষার আগে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির জেলা সভাপতি নির্মল বড়–য়া, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ এর জেলা সভাপতি মোহাম্মদ সোলায়মান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ জেলা সভাপতি মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র জেলা যুগ্ম সমন্বয়ক, মোঃ শহীদুল ইসলাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম অধিকার আন্দোলন জেলা সভাপতি মোঃ কামাল উদ্দিন, সচেতন নাগরিক ঐক্য এর জেলা সমন্বয়ক বিজয় ধর, সমন্বয়ক পলাশ চাকমা, মোঃ আজিজুল ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদ জেলা সদস্য সচিব ওয়াহিদুজ্জামান রোমান, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ জেলা সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলাম এর স্বাক্ষরিত চেয়ারম্যান বরাবরে প্রেরিত স্মারকলিপি দেওয়ার কারনে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয় বলে অনেকেরই দাবি। কেননা পরীক্ষা স্থগিতের জন্য এসব সংগঠন পরিষদ চেয়ারম্যানকে ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। ফলে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেন জেলা পরিষদ।

জানা গেছে, এবারও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা গত মঙ্গলবার (১১নভেম্বর) স্থগিত করা হলে পরের দিন বুধবার শিক্ষক প্রার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সকালেই জেলা পরিষদে জড়ো হয়ে বিক্ষাভ করেন এবং পরিষদের প্রধান ফটক সহ অভ্যন্তরীণ সকল ফটকগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেয় পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে। এসময় পরিষদে সরকারি এবং বেসরকারি লোকজন আসলে বাঁধার মূখে প্রবেশ করতে পারেনি দীর্ঘ তিন ঘন্টা। অবশ্য তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আবারো শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আগামী ২১ নভেম্বর (শুক্রবার) বিজ্ঞপ্তি (অফিস আদেশ) জারি করা হয়েছে।

সেদিন সরেজমিনে দেখা যায়, বুধবার সকালে পরিষদের প্রধান ফটক সহ অভ্যন্তরীণ ফটক গুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বিক্ষাভ করলে প্রায় দেড় থেকে দুঘন্টা পর জেলা পরিষদের সদস্য দেব প্রসাদ দেওয়ান ও মোঃ মিনহাজুল ইসলাম বিক্ষোভকারী শিক্ষক প্রার্থীদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের দাবির মূখে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস প্রদান করেন। কিন্থু শিক্ষক প্রার্থীরা একঘন্টার মধ্যে সদউত্তর না পেলে লাগাতার বিক্ষোভ করবেন বলে সাফ জানিয়ে দেন। এসময় জাতীয় দৈনিক, টিভি চ্যানেল ও স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা আশ^াস পেলে পরিষদের ফটকগুলোর তাল খুলে দিয়ে সেখান থেকে যার যার বাড়ি চলে যান।

এদিকে বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে বেশ কিছু শিক্ষক প্রার্থীর সাথে কথা বললে তারা জানান, আমরা এ নিয়ে তিনবার বিমুখ হতে চলেছি। ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসেও শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিতে পারছিনা। আমার এখন উভয় সংকটে পড়েছি, টাকা পয়সাও যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন অনেকের বয়স চলে যাবে সরকারি চাকরী পাওয়ার ক্ষেত্রে, আবার কেউ কেউ বলছেন এটির আশায় অন্য কোথাও যেতে পারছিনা। জেলা পরিষদে যখনই কোন নিয়োগ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তখনই কোন না কোন রাজনৈকি দল বা স্থানীয় সংগঠন এসব বিষয়ে বিরোধীতা করেন তাদের মতো না হলে হুমকীও প্রদান করেন।

তারা আরো বলেন, এটি সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান সেই সাথে এ নিয়োগে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া অবস্থার উত্তোরণ ঘটাবে, কেননা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষক শুন্যতার কারনে প্রাথমিক শিক্ষার চরম ব্যঘাত ঘটছে। অভিভাবকরা বার বার শিক্ষা বিভাগকে তাগাদা দিয়ে আসছে। তারা আরো বলেন, শিক্ষক শুন্যতার চরম অবস্থার প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরাও নানান সময়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন। শিক্ষক নিয়োগে বিরোধীতাকারীদের বিষয়ে বলেন, সমস্যা হলে, মনে করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলা উচিৎ কিন্তু বৈষম্যমুলক সহ নানান দাবি করে একটি পরিষদকে সরাসরি হুমকী দিয়ে রাষ্ট্রের জনস্বার্থের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা কাম্য নয়। এসবের কারনে অনেক ছেলে মেয়ে বার বার বেকায়দায়ও পড়ছে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষক পরীক্ষার্থীরা আক্ষেপ করে বলেন, এ পর্যন্ত যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে পরিষদের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা যতবার সিদ্ধান্ত দিয়েছে ততবারই কোন না কোন বাঁধা সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের সাথে যা হচ্ছে এসব বিষয়ে আইনী প্রদক্ষেপ নেওয়া দরকার। মনে হচ্ছে দালালের খপ্পড়ে পড়ে অনেকটা হালাল বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেন।

অপর দিকে সেদিনই দুপুরে জেলা পরিষদের সদস্য মিনহাজ এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, চেয়ারম্যান পরিষদে আসলে তিনি সহ সকল সদস্যদের আলোচনা সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে দ্রুতই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, শিক্ষক প্রার্থীদের বিক্ষোভ এর বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী এবং সচেতন মহল বলেন, বিরোধীতা করলেই যে সবই সঠিক তা ভাববার কোন যোক্তিকতা নেই। বর্তমান সরকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্তবর্তী সরকার। টানা বৈষম্য হয়ে আসছিল এবং হচ্ছিল বলেই একটি সরকারকে হঠিয়েছে তারা। কিন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্রটি ভিন্ন। তবে কিছু কিছু বিষয় আছে অনেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপাবলম্বন করে। পরিষদ বৈষম্য করলে বা আইন অমান্য করলে যারা অভিযোগ তোলেন তাদের উচিৎ পরিষদের সাথে টেবিল বৈঠক করে সেসব বিষয়ে সঠিক গতিতে নিয়ে আসা। কিন্তু সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের জনস্বার্থের কাজে যখন যা ইচ্ছে বাঁধা দেওয়া সব সময় সঠিক হবে সেটিও ভাববার কোন সুযোগ নেই, কেননা জেলা পরিষদ নিজস্ব আইনেই পরিচালিত। তবে গণতান্ত্রিকভাবে সকলের অধিকার আছে জনগনের স্বার্থ বিরোধী কাজে বাঁধা দেওয়া সেটিও হতে হবে গণতান্ত্রিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সময় ঘন্টা বেঁধে দেওয়া যেমন হুমকি তেমনি প্রধান ফটকে তালা দেওয়াও হুমকী এবং অপরাধ যা কারোরই কাম্য নয়।

উল্লেখ্য যে, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষা বিভাগের সহকারী শিক্ষক পদে ৫৮৯টি শূন্যপদের বিপরীতে ৬ হাজার ৬৪৮ জন আবেদন করেন। এসব শুন্যপদ পূরণে ২০২২ সালে জেলা পরিষদ শিক্ষক নিয়োগ দিলে নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত হলে নিয়োগ পরীক্ষা দুইবার স্থগিত হয়। অবশেষে গত ২১ নভেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা তারিখ ঘোষণা হলে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জেলা কমিটি সহ স্থানীয় আরো ৬টি সংগঠন এ নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ম বহির্ভুত, এক তরফা, তথ্য বিভ্রাট ও বৈষম্যমূলক দাবি করে স্থগিত করার জন্য ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দেন অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচী দেওয়া হবে। যার কারনে ১৪ নভেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা ১১ নভেম্বর স্থগিতের আদেশ জারি করে পরিষদ অধিভুক্ত শিক্ষা বিভাগ। তবে শিক্ষক প্রার্থীরা এ সংবাদ পেয়ে বুধবারই পরিষদে বিক্ষোভ করেন এবং প্রধান ফটক সহ অভ্যন্তরীণ সকল ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করলে পরে আগামী ২১ নভেম্বর পরীক্ষা নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করে পরিষদ।