॥ মোঃ আবুল হাসেম, মাটিরাঙ্গা ॥
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় পাহাড়ের ঢালে এক অভিনব পুষ্পশৈলী নজর কাড়ছে সবার। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সাজানো লাল-সবুজের জনপদ মাটিরাঙ্গা। আর এই জনপদের সৌন্দর্যকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টার। প্রথাগত চাষাবাদের বাইরে গিয়ে এবার তারা প্রদর্শন করছে এক অনন্য অভিনব পুষ্পশৈলী ‘পাঁচ স্তরের বাঁশের কাঠামোয় গাঁদা ফুলের চাষ’। পাহাড়ের ঢালে সোনালি আর কমলা রঙের গাঁদা ফুলের এই মায়াবী রূপ এখন পর্যটক ও কৃষিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ।
বাগানটিকে নতুন রূপে সাজাতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মাটিরাঙ্গা উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টার-এর উদ্যানতত্ত্ববিদ মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাসুম। পরিকল্পিত নকশা, সুশৃঙ্খল বেড বিন্যাস, মৌসুমি ফুলের সমন্বিত রোপণ এবং আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি বাগানটিকে ধীরে ধীরে একটি নান্দনিক ও শিক্ষণীয় উদ্যান হিসেবে গড়ে তুলছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে বাগানের প্রতিটি অংশে রাখা হচ্ছে আলাদা আলাদা নান্দনিক বৈশিষ্ট্য কোথাও রঙের সামঞ্জস্য, কোথাও উচ্চতা ও স্তবিন্যাস, আবার কোথাও প্রজাতিভিত্তিক প্রদর্শনী। জৈব ও অজৈব সারের সুষম ব্যবহার, নিয়মিত পরিচর্যা এবং নতুন জাতের ফুল সংযোজনের মাধ্যমে তিনি বাগানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছেন। তাঁর এই আন্তরিক উদ্যোগে হর্টিকালচার সেন্টারটি শুধু একটি চাষকেন্দ্র নয়, বরং সৌন্দর্যচর্চা, প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
সাধারণত মাটিতে সারিবদ্ধভাবে গাঁদা চাষ দেখা গেলেও এখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ধাপে ধাপে উঁচু পাঁচটি স্তর। নিচ থেকে ওপরের দিকে সরু হয়ে যাওয়া এই পিরামিড সদৃশ কাঠামোয় মাটির সাথে সুষম সার মিশিয়ে রোপণ করা হয়েছে শত শত গাঁদা গাছ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের বুক চিরে আকাশের দিকে উঠে গেছে এক পুষ্পের মিনার। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার হর্টিকালচার সেন্টারে ফুটে উঠেছে এক অপূর্ব নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতীক। পাঁচ স্তরের বাঁশের পিরামিড, যেখানে রঙিন গাঁদা ফুলের ঝলমলে সমারোহ দর্শনার্থীদের মন মুগ্ধ করে রেখেছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই সৃজনশীল উদ্যোগটি এখন ফুলপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই পিরামিডাকার কাঠামোতে পাঁচটি সুন্দর স্তরে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের গাঁদা ফুল ইনকা অরেঞ্জ, ইনকা ইয়েলো, আফ্রিকান গাঁদা, ফায়ারবল এবং মেরিগোল্ড সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে লাল রেড সেলভিয়া। মোট প্রায় সাড়ে তিনশত গাঁদার চারা এবং ১২টি সেলভিয়া চারা রোপণ করে তৈরি করা হয়েছে এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। সোনালি, কমলা ও লাল রঙের সমন্বয়ে ফুটে উঠেছে এক মোহনীয় দৃশ্য, যা যেন প্রকৃতির রঙের তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত চিত্রকল্প।
নির্মাণ প্রক্রিয়াটও ছিল অত্যন্ত যতœশীল ও পরিকল্পিত। হর্টিকালচার সেন্টারের নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত বাঁশ সংগ্রহ করে প্রয়োজনমতো কেটে ছাঁটাই করা হয়েছে। পাঁচটি লেয়ার (স্তর) নির্মাণ করে প্রতিটিতে ভার্মিকম্পোস্ট, ট্রাইকোকম্পোস্ট, গোবর, ডিএপি ও পটাশ সার মিশ্রিত উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। কয়েকদিন পর নিজস্ব পদ্ধতিতে উৎপাদিত গাঁদার চারা রোপণ করে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে এই সৌন্দর্যের।
শুধু এই পিরামিডই নয়, মাটিরাঙ্গা উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টার-এর পুরো বাগানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা প্রজাতির ফুলের এক বর্ণিল সমারোহ। সুশৃঙ্খল বেড ও সারিবদ্ধ আঙিনায়য় ফুটে আছে ডাবল পেটাল হলিহক, ডোয়ার্ফ ফায়ারবল, হাইব্রিড সেলভিয়া, ন্যাস্টারশিয়াম, কচমচ, ব্লুসেলভিয়া, পপি, জিপসি, ডালিয়া, ক্যালেন্ডুলা, হাজারি গোলাপ, বাগানবিলাস, ক্যালানকোই, গ্লাডিওলাস, পিটুনিয়া, সেলোসিয়া, স্টার ফুল ও গেইলার্ডিয়া। পাশাপাশি রয়েছে ১০টি প্রজাতির গোলাপ যার রঙ, আকার ও পাপড়ির বিন্যাসে ফুটে উঠেছে বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয়।
বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটলেই চোখে পড়ে রঙের স্তরবিন্যাস কোথাও গাঢ় লাল ও বেগুনির আবেশ, কোথাও হলুদ-কমলার উজ্জ্বলতা, আবার কোথাও সাদা ও গোলাপির কোমলতা। মৌসুমি ফুলের এই সাজানো পরিবেশ শুধু দৃষ্টিসুখই দেয়া না, বরং উদ্যানচর্চার একটি জীবন্ত পাঠশালায় রূপ নিয়েছে। প্রতিটি বেডে ফুলের পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও সেচ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত চর্চা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
ফুলপ্রেমীদের জন্য এটি যেন এক রঙের উৎসবমুখর প্রাঙ্গণ যেখানে একই সঙ্গে উপভোগ করা যায় নান্দনিক সৌন্দর্য, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য এবং পরিকল্পিত বাগান ব্যবস্থাপনার নিপুণতা। এমন সমৃদ্ধ ও সুশোভিত বাগান মাটিরাঙ্গায় প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক সৌন্দর্য্যচর্চার এক অনন্য উদাহরণ হয়েছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টার-এর উদ্যানতত্ত্ববিদ মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, “সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা। গাঁদা ফুল আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় ও সহজলভ্য ফুল। কিন্তু বিভিন্ন রঙ ও জাতের গাঁদা একসঙ্গে, একই দৃষ্টিতে উপভোগ করার সুযোগ খুব কমই তৈরি হয়। সেই ভাবনা থেকেই পরিকল্পিতভাবে পাঁচ স্তরের বাঁশের পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা এক নজরে রঙের বৈচিত্র্য ও নান্দনিক বিন্যাস উপভোগ করতে পারেন।
তিনি আরো জানান, পুরো কাঠামোটি নিজস্ব পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির উর্বরতা নিশ্চিত করতে জৈব ও রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে গাছের বৃদ্ধি সুস্থ ও সমান হয় এবং প্রতিটি স্তরে ফুলের রঙের সামঞ্জস্য বজায় থাকে। রঙের বিন্যাস নির্ধারণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেন উপরের স্তর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি দৃষ্টিনন্দন সামঞ্জস্য তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, এটি শুধু একটি সৌন্দর্যবর্ধনমূলক প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও। এই কেন্দ্র থেকে প্রতি মাসে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল বিক্রি করে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। পরিকল্পিত চাষাবাদ ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এই আয় আরও বাড়ানো সম্ভব। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় ফুলচাষিদের অনুপ্রাণিত করবে এবং স্বল্প জায়গায় নান্দনিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ফুলচাষের নতুন ধারণা দেবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও আগ্রহীদের জন্য এটি একটি বাস্তব শিক্ষণীয় প্রদর্শনী হিসেবেও কাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “মাটিরাঙ্গায় এমন ব্যতিক্রমী ও পরিকল্পিত ফুলের প্রদর্শনী আগে কখনও দেখিনি। পাঁচ স্তরে সাজানো গাঁদা ফুলের রঙের সমন্বয় সত্যিই দারুণ লেগেছে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রঙের যে বৈচিত্র্য ও সামঞ্জস্য রাখা হয়েছে, তা চোখে পড়ার মতো। দূর থেকেই পিরামিডটি নজর কাড়ে, আর কাছে গেলে তার সৌন্দর্য আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রুবাইয়াত তানিম তাঁর ছেলোকে সঙ্গে নিয়ে পিরামিডটি দেখতে এসে বলেন, “ব্যস্ততার মাঝেও আজ ছেলেকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসলাম। প্রকৃতির কাছাকাছি এমন একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। পাঁচ স্তরের বাঁশের কাঠামোয় বিভিন্ন রঙের গাঁদা ফুলের সমন্বয় দৃষ্টিনন্দন ও প্রশংসনীয়। তিনি আরও বলেন, শিশুরা বইয়ে ফুল ও উদ্যানচর্চা সম্পর্কে পড়ে, কিন্তু বাস্তবে এভাবে সাজানো প্রদর্শনী দেখলে তাদের শেখার আগ্রহ আরও বাড়ে। আমার ছেলে বিভিন্ন ফুলের নাম জানতে চাচ্ছে, কোনটা কোন জাতএটি তার জন্য একটি আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। এমন উদ্যোগ নিয়মিত হলে পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখার মতো একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে এবং নতুন প্রজন্ম প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
স্থানীয়দের মতে, এমন সৃজনশীল ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ কৃষি সম্প্রসারণে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং ফুলচাষে মানুষের আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। মাটিরাঙ্গায় এই পাঁচ স্তরের বাঁশের পিরামিডে গাঁদা ফুলের মনোরম প্রদর্শনী এখন এক নতুন সৌন্দর্যের মিলনমেলাযেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতা একাকার হয়ে উঠেছে।