জেলা পরিষদের আইনেই শিক্ষক নিয়োগ যৌক্তিক, প্রতিবন্ধকতাগুলো আইন বিরোধী ও ষড়যন্ত্র
॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে গিয়েও যেন হলো না শেষ। নানান বিরোধিতা, প্রতিবন্ধকতা ও ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা একবার দু’বার নয় রীতিমত পঞ্চমবার স্থগিত করতে হলো জেলা পরিষদকে। ফলত চাকরির আশায় অপেক্ষা করতে করতে আবেদনকারী অনেক ছেলেমেয়ে রীতিমত বেকার হওয়ার পথে। তারমধ্যে চরমভাবে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে দূর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে জেলা পরিষদের আইনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার আইনসিদ্ধ সেখানে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতিবন্ধকতাগুলো আইন বিরোধী ও ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছে বঞ্চিত শিক্ষকপ্রার্থী আবেদনকারীরা। রীতিমত হতাশায় হতাশায় সময় পার করতে গিয়ে এখন ক্ষোভের মধেই রয়েছে শিক্ষক প্রার্থীরা।
দেখা যায়, জেলার প্রত্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কারনে বিগত সরকারের সময়ের মনোনীত পরিষদ এর চেয়ারম্যান অংশুইপ্রুশিক্ষক শূন্যতাগুলো পরিপূর্ণ করতে ২০২২ সালের ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। পরে ১ সেপ্টেম্বরের নিয়োগ পরীক্ষা অনিবার্য কারনে স্থগিত করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ২ মে লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষনা করা হলে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে সে পরিষদের সময়েই শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দ্বিতীয়বারের মতো স্থগিত হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বৈষম্য ও কোটাবিরোধী ছাত্রজনতার জুলাই আন্দোলনে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন ঘটলে প্রাথমিকভাবে এর সকল কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলে ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কাজের গতি ফিরে আসে। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে অন্তবর্তি পরিষদ গঠন করা হয়।
এবার গঠিত অন্তর্বর্তী পরিষদের অধীন আবারো ১৪ নভেম্বর ২০২৫ইং লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জেলা কমিটি সহ স্থানীয় আরো ৬টি সংগঠন এ নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ম বহির্ভুত, এক তরফা, তথ্য বিভ্রাট ও বৈষম্যমূলক দাবি করে স্থগিত করার জন্য ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দেয় অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচী দেওয়া হবে উল্লেখ করলে ১৪ নভেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা ১১ নভেম্বর স্থগিতের আদেশ জারি করে পরিষদ অধিভুক্ত শিক্ষা বিভাগ। অপরদিকে শিক্ষক প্রার্থীরা এ সংবাদ পেয়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে ১২ নভেম্বর পরিষদে এসে বিক্ষোভ করেন এবং বিক্ষুবদ্ধরা জেলা পরিষদের প্রধান ফটক সহ অভ্যন্তরীণ সকল ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করলে পরে পরিষদ আবারো ২১ নভেম্বর পরীক্ষা নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু ঐসব সংগঠনগুলো তার বিরোধিতা করে এবার ৩৬ঘন্টার হরতাল কর্মসূচী ঘোষনা করে এবং হরতালের প্রথম দিনই পরিস্থিতি ভিন্নখাতে প্রভাবিত হবে এমন আপত্তিরমুখে শেষেমেষ ২০নভেম্বর দুপুরে লিখিত পরীক্ষা পঞ্চমবারের মতো স্থগিত করেন পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার এসময় সকল সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। ফলে চাকরির আশায় বেকারের পথে অনেক ছেলে মেয়ে এবং বিপদগ্রস্ত দূর্গমের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ঐক্য ব্যানারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা কোটা ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর দাবিতে জেলা পরিষদের প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে কমপ্লিট শাটউন কর্মসুচী পালন করে। পরে ২৬নভেম্বর বিরোধীতাকারীদের সাথে পরিষদ চেয়ারম্যান সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা সুরাহার জন্য বৈঠকে বসলেও কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এবার পরিষদ এ বিষয়ে পার্বত্য চটগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানালে মন্ত্রণালয় সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণায়লকে প্রেরণ করে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আইন বিভাগের নিকট প্রেরণ করে বলে পরিষদের প্রশাসন সুত্র জানায়। সুতরাং জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তরিত বিভাগ সমুহে জনবল নিয়োগ বিষয়ে পরিষদের নিকট অর্পিত ক্ষমতাবলে করতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখানে সুযোগ নাই বলেই আইন বিভাগের কাছেই বিষয়টির সুরাহায় পত্র প্রেরণ করেন বলে অনেকেই মনে করেন। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী গঠিত জেলা পরিষদ আইন দ্বারা পরিষদ তার কার্যক্রম পরিচালিত করবে। এক্ষেত্রে হস্তান্তরিত প্রতিষ্ঠান সমুহে নিয়োগ, বদলিজনিত বিষয়, পরিবর্তন-পরিমার্জন, সংযোজন-বিয়োজন করতে পরিষদই আইন দ্বারা নির্ধারণ করবে।
এদিকে জেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট বিরাজ করায় প্রায় ছয়শতটি শূন্যপদে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করতে গিয়ে নানান আপত্তি এবং ষড়যন্ত্রের কারনে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় লিখিত পরীক্ষা আহ্বান করলেও পরিষদ একে একে পাঁচবারই স্থগিত করতে বাধ্য হয়। ফলে শিক্ষক প্রার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ এবং হতাশাও বিরাজ করছে। শিক্ষক প্রার্থী ছাত্র-ছাত্রী অনেকে জানান, ২২ সাল থেকে ২৫ সাল চলছে অপেক্ষা করতে গিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করার বয়সও অনেকের চলে যাচ্ছে, আশায় থেকে অন্য কিছু করারও সুযোগ থাকছে না। জেলা পরিষদের আইনেই শিক্ষক নিয়োগ যৌক্তিক, প্রতিবন্ধকতাগুলো আইন বিরোধী ও ষড়যন্ত্র বলে তারা দাবি করে। অপর দিকে গত বৃহস্পতিবার জেলা পরিষদের প্রশাসনিক বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকে কোন সিদ্ধান্ত জেলা পরিষদ এখনো পায়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী পরিষদ শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমেই জাতীয় রাজনৈতিক একটি দলের স্থানীয় কিছু নেতবৃন্দ সরাসরি অফিসে এসে বিরোধীতা করেছিল বলে প্রশাসনিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এদিকে নিয়মতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়াকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার পাঁয়তারা বলে দাবি করছেন জাতীয়, স্থানীয় রাজনৈতিক এবং সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দরা। তারা বলছেন, পার্বত্য চুক্তি অনুয়ায়ী জেলা পরিষদের গঠিত আইন পরিবর্তন করতে নির্বাচিত সংসদ প্রয়োজন। আইনী বিষয়গুলোকে না মেনে না বুঝেই জেলা পরিষদের কাজে জোর পূর্বক বাধাসৃষ্টি করা হয়েছে। ইচ্ছে হলেই পরিষদকে সময় ঘন্টা বেঁধে দিয়ে চেয়ারম্যানকে সহ হুমকি দিচ্ছে, কেউ পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আবার কেউ বিরোধীতা করে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করে পরিষদের প্রধান ফটকগুলোতে তালা মেরে দিচ্ছে। সরকারের প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাজে বাঁধা দিয়ে এসব ঘটনাচিত্রগুলো যেন জেলা পরিষদকে রাষ্ট্রের একটি অসহায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে।