রাঙ্গামাটিতে কলা গাছের তন্তু দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও মাশরুম উদ্ভাবন
॥ মুন মারমা ॥
কেউ কখনো কল্পনাই করেনি কলা গাছ থেকেও মানুষের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা যায়। তাই সবাইকে অবাক করে দিয়েছে উইভ নামে রাঙ্গামাটির স্থানীয় একটি এনজিও সংস্থা। কলা গাছের তন্তু বা সুতা দিয়ে তারা তৈরি করেছেন নারীদের অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস স্যানিটারি ন্যাপকিন। এ স্যানিটারি ন্যাপকিন পুণঃব্যবহারযোগ্য। এর পাশাপাশি কলা গাছের শুকনো পাতা থেকে মাশরুম চাষেরও দারুণ এক উদ্ভাবন করেছে এই সংস্থাটি। অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের জীবন ধারণের জন্য গাছ-বাঁশ বা প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে নানান তৈজসপত্র ও নিজ্য প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করে আসছে। বাঁশের তৈরি কুলা, পুল্যাং, মাচা, মই, মাদুরসহ আরো অন্যান্য অনেক কিছু।
রবিবার (৩১আগষ্ট) সকালে রাঙ্গামাটি শহরের সাবারাং রেস্তোরা মাঠে কলা গাছের তন্তু বা সুতা দিয়ে নারীদের পুন:ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও শুকনো কলা পাতা ব্যবহার করে মাশরুম উৎপাদন বিষয়ক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। উইভ এর আয়োজনে এবং আর এস এফ স্যোশাল ফাইন্যান্সের সহযোগিতায় দিনব্যাপী প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ মারুফ।
এ সময় প্রধান অতিথি মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ মারুফ বলেন, কলা গাছের তন্তু বা সুতা দিয়ে নারীদের পুন:ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির মাধ্যমে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা স্বাস্থ্য সুরক্ষার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, উইভ এনজিওর মাধ্যমে কলা গাছের সুতা দিয়ে নারীদের পুনঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও শুকনো কলা পাতা ব্যবহার করে মাশরুম উৎপাদন অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ যা প্রশংসার দাবী রাখে। জনবান্ধব এই কার্যক্রম যাতে পুরো পার্বত্য এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া যায় সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি অবহিত করা হবে।
উইভের নির্বাহী পরিচালক নাইউ প্রু মারমা মেরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোৎ মনিরুজ্জামান, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সহকারী নির্বাহী কর্মকর্তা সুচিং মারমা, নারী নেত্রী টুকু তালুকদার, এ্যাডভোকেট সুষ্মিতা চাকমা প্রমুখ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, কলা পাতা থেকে মাশরুম তৈরি হচ্ছে এবং কলা গাছের সুতা দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি হচ্ছে একটা খুবই ভালো উদ্যোগ। স্থানীয় মেশিন দিয়ে কলা গাছ থেকে সুতা তৈরি হচ্ছে। সুতা রৌদ্রে শুকানো হচ্ছে। কলা গাছের সুতা ও পাতা দুটো অর্গানিক পরিবেশ-বান্ধব। আমরা যদি আধুনিক মেশিন যুক্ত করতে পারি তাহলে এই প্রডাক্টগুলো উচ্চ মূল্য সহ বিদেে ও রপ্তানি করা যাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভুমিকা রাখবে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক নাইউ প্রু মারমা (মেরী) বলেন, আরএসএফ সোশ্যাল ফাইন্যান্স এর আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত উন্নত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এলাকায় পিছিয়ে পড়া ও সুবিধা বঞ্চিত নারীদের জন্য স্থানীয় সম্পদ কলা গাছের শুকনো কলা পাতা দিয়ে মাশরুম তৈরি ও কলা গাছের সুতা দিয়ে পুনঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও ব্যবহার করে নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং কলার শুকনো পাতা দিয়ে মাশরুম চাষ করে স্বাবলম্বী করার জন্য প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এতে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি সদর ও কাউখালী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে তিনটি জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছে। যার উপকার ভোগীর সংখ্যা ৩ হাজার অধিক হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষিরা বিভিন্ন ফলের বাগান করে থাকে। তার মধ্যে কলাগাছ অন্যতম। এই কলা গাছের কোনো কিছু ফেলনা নয়। কলা গাছের ফল, কলার থোর, গাছের ভেতরে বুগলি এগুলো সব খাওয়া যায়। কিন্তু আমরাই প্রথম কলা গাছ থেকে সুতা বের করে বিভিন্ন প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে নারীদের জন্য পুণঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করে দেখিয়েছি। কয়েকবার পর্যন্ত এই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করা যায়। খুবই সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ। এগুলো আমরা বিনামূল্যে স্কুল পর্যায়ে কিশোরী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের মাঝে বিতরণ করে থাকি। আমরা চাই আমাদের এই উদ্ভাবন প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে। আমরা বিএসটিআইয়ের অনুমোদন চেয়েছি। অনুমোদন পেলেই বৃহৎ আকারে শুরু করতে পারবো তার জন্য প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা।
আলোচনা সভা শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ মারুফসহ অন্যান্য অতিথিরা কলা গাছের তন্ত দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও মাশরুম উৎপাদন বিষয়ক দিনব্যাপী প্রদর্শনী ষ্টল ঘুরে দেখেন।